- Get link
- X
- Other Apps
অয়লারের আশ্চর্য ফর্মূলা!!
আমরা খাতা কলম পেলেই কত কি আঁকিবুকি কাটি। জ্যামিতির বইতে শেখা কতরকম জ্যামিতিক চিত্র নিয়ে কত কি গণনা করি।
এই যেমন, বর্গক্ষেত্র (square), ত্রিভুজ (triangle), বৃত্ত (circle) ইত্যাদি অথবা এসব মিলিয়ে নানারকমের কত কি আকার
আকৃতির ছবি। এই যেমন ধরো, একটা বর্গক্ষেত্র আঁকলে, তার সাথে একটা ত্রিভুজ জুড়ে দিলে, তার পর এ কোনা ও কোনা
একটা লাইন দিয়ে জুড়ে দিলে, ইত্যাদি যেমন খুশি।
ধরো, একটা খাতার উপর (তার মানে একটা সমতলের উপর) এভাবে লাইন টেনে জ্যামিতিক ছবি আঁকছো, এগুলো কে বলা হয়
ইউক্লিডিও জ্যামিতি (Euclidean Geometry)। আবার ধরো এই ছবিগুলো একটা বক্রতলের উপর আঁকার চেষ্টা করছো, মনে
করো, একটা বেলুনের উপর বা কড়াইয়ের উপর লাইন টেনে আঁকার চেষ্টা করছো, তখন অবশ্য সব নিয়মকানুন পাল্টে যাবে যা যা
শিখেছো এখন জ্যামিতির বইতে। এই বক্রতল জ্যামিতি কে ইংরেজিতে বলা হয় Differential Geometry. এর গুরুত্ব অনেক। কেননা,
ধরো আমাদের এই পৃথিবী, সে তো নিজেই বক্রতল, অথবা আমাদের এই মহাবিশ্বের স্থান-কাল এর আকার আকৃতি, যাকে বলে
space-time! পরে, বড় হয়ে এসব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখবে যে এই differential geometry নিয়ে অঙ্ক করতে হচ্ছে! বেশ
ঝামেলার ব্যাপার! কিন্তু কি আর করা যাবে? পৃথিবীর তলের উপর (বা ধরো একটা বলের উপর) যদি একটা বিন্দু থেকে অন্য
বিন্দুতে নূন্যতম পথে (minumum distance) যেতে চাও, সে তো আর সরলরেখা (straight line) হবে না! তাকে বলবে geodesic!
যা হোক সেসব কথা। এখন যেটা বলছি, তা হলো এই যে, যা কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করছো, সমতল বা বক্রতলের উপর, ধরো
একটা বদ্ধ তল (closed surface) আঁকলে খাতার উপর, এবার গনণা করো সেই জ্যামিতিক ছবিতে কটা শীর্ষ বিন্দু (Vertex) আছে,
কটা লাইন বা ধার (Edge) আছে। মনে রাখতে হবে লাইনগুলো সব এক একটা শীর্ষ বিন্দু বা vertex এ গিয়ে মিলিত হয়। যেমন ধরো
একটা ত্রিভুজে তিনটে শীর্ষবিন্দু আছে আর তিনটে লাইন, মানে হলো ত্রিভুজের তিনটে বাহু। এবার দ্যাখো কটা ঘেরা জায়গা
(closed surface) তৈরি হলো। এই আবদ্ধ বা ঘেরা জায়গা (surface) কে সংক্ষেপে Face বলতে পারো। যেমন ত্রিভুজের একটাই
Face! বর্গক্ষেত্র বা আয়তক্ষেত্রের ও একটাই Face. একটা বর্গক্ষেত্রের মধ্যে কোনাকুনি একটা লাইন টেনে দিলে দুটো ভাগ
বা ক্ষেত্র বা Face তৈরি হয়ে গেলো।
ছবিগুলো মনে মনে ভেবে নাও। ভালো হবে যদি খাতা কলম নিয়ে বসো। এসব তো হলো। এত সব বলে এবার যে বিষয় টার কথা বলবো,
তা হলো এই সব জ্যামিতিক চিত্রগুলোর মধ্যে থেকে Vertex (V), Edge (E) আর Face (F) কটা আছে খুঁজে বার করে তুমি খাতায়
লিখলে। এবার দ্যাখো এদের ভিতর কি কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে? মানে, এই তিনটে দিয়ে কোনো ফর্মূলা (formula) বানানো যাবে
যা সবরকম আবদ্ধ তল (closed surface) এর জন্য একই?
আছে। কি সেটা?
আমার এই লেখার পরের অংশটুকু পড়ার আগেই কাগজ কলম নিয়ে গবেষণা করতে বসে যাও। যদি নিজে নিজে খুঁজে বার করতে পারো
তাহলে অবশ্যই নিজেই নিজেকে বাহবা দাও। তারপর না হয় পরের অংশটুকু পড়ো।
আসলে এটা নিয়ে হাজার বছর ধরে কোনো গণিতজ্ঞ, কোনো পন্ডিত, কোনো দার্শনিক বা অঙ্কপ্রেমী লোক কেউ ভাবে নি!
পিথাগোরাস, এরিস্টটল, আর্কিমিডিস, নিউটন কেউ না!
তবে ভেবেছিলেন একজন, আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে, লিওনার্ড অয়লার (Leonard Euler)। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা
কয়েকজন গণিতজ্ঞদের মধ্যে তিনি একজন। বড় হয়ে তাঁর কথা পড়বে।
তিনি দেখালেন -
V - E + F = 1
এই হলো ফর্মূলা! মিলিয়ে নাও। একটা চতুর্ভুজের ক্ষেত্রে, V = 4, E = 4, F = 1. তাহলে দ্যাখো ফর্মূলা টা খাটছে। আবার ধরো,
তুমি চতুর্ভুজটার দুই কোনা একটা লাইন দিয়ে জুড়ে দিয়ে ক্ষেত্র টা কে দুটো ভাগে ভাগ করে ফেললে। তাহলে, এখন দাঁড়ালো,
V = 4, E = 5, F = 2.
এতটাই সহজ একটা ফর্মূলা! অথচ কারো মাথায় আসে নি! আর এই সহজ ফর্মূলার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলো গণিতের সব
নানান দিক, যা দিয়ে বিজ্ঞানের নানা কঠিন সব সমস্যার সমাধান হতে থাকলো! এত সহজ অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ফর্মূলা
কে এযুগের পৃথিবীর সব তাবড় তাবড় গণিতজ্ঞরা বলেছেন গণিতের ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ ফর্মূলারগুলোর মধ্যে
প্রথম না হলেও, দ্বিতীয়। প্রথম টাও অয়লার এর ই বানানও!!
যাই হোক। এবার ছবি এঁকে লেগে পরো মেলাতে। আর হ্যাঁ, আরো দু চারটে কথা। ধরো সরলরেখা টেনে জুড়ে জুড়ে এক একটা ছবি
এঁকেছো। এবার সরলরেখার বদলে যদি বক্র রেখাও আঁকতে, তাহলেও হিসেব টা একই থাকতো। ধরো, একটা রাবার ব্যান্ড নিয়ে
তিনটে পিন আটকে টানটান করে একটা ত্রিভুজ বানিয়েছো। এবার যদি রাবার ব্যান্ড টা কে ঢিলে করে দাও তাহলে আর ত্রিভুজ
থাকলো না, সরলরেখা বেঁকেচুরে একটা কিছু বিকৃত ব্যাপার হলো। হুম...। কিন্তু তাতেও অসুবিধা কিছু হবে না, হিসেব করে দ্যাখো,
ফর্মূলা টা তবু খাটবে।
আচ্ছা যদি এই সমতলের দ্বিমাত্রিক জ্যামিতি ছেড়ে আমরা একটা তিনমাত্রিক জ্যামিতি (solid geometry) র কথা ভাবি,
ধরো বর্গক্ষেত্র না হয়ে একটা ঘনক (cube) হলো। এরকম ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি তো আমাদের হাতের সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছে কত।
বাক্স, ইঁট কাঠ, খাট, টেবিল, ফুটবল বা আরো কত কি। এদের ক্ষেত্রেও তুমি হিসেব করে বার করো কটা কোনা আছে, কটা ধার
আছে আর কটা তল। তাহলে এদের ক্ষেত্রে ফর্মূলা টা কি হবে?
আসলে একটু পাল্টে যাবে।
. V - E + F = 2
ভীষণ মজার না?
আবার ধরো এই যে ঘনক বা যে কোনো একটা ত্রিমাত্রিক বস্তু বানালে, ধরো সেটা শক্ত কিছু যেমন কাঠ বা পিচবোর্ড দিয়ে নয়।
তুমি বানালে, আটার লেচি দিয়ে, রাবার বা নরম মাটি দিয়ে। এবার সেটা নিয়ে এদিক ওদিক মোচড় দিয়ে বস্তুর আকৃতি পাল্টে দিলেও
কিন্তু ফর্মূলা পাল্টাবে না তার জন্য! আসলে এই যে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির পরিবর্তন করছো, তাই নিয়েও আবার
অনেক ব্যাপার আছে, অনেক কিছু মাপঝোঁক আছে আর এটা গণিতের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যাকে বলে টপোলিজি (Topology),
যা হলো মূলতঃ নরম জিনিস দিয়ে তৈরি, যা কিনা বিকৃত করা যায় এরকম জ্যামিতিক বস্তুর হিসাবনিকাশ। Deformable Geometry!
অনেকে সহজ করে বলে rubber sheet geometry! এসব নিয়েও বড় হয়ে পড়বে আর বিজ্ঞানের গবেষণায় এসব নানা জিনিসের ভূমিকা
নিয়ে জানবে। তবে যাই হোক, এই Topological figure এর ক্ষেত্রেও ওই অয়লারের ফর্মূলা কিন্তু একই থাকবে!
(অভিজিৎ করগুপ্ত, ইমেইল- kg.abhi@gmail.com)
|
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment