এই লকডাউনে ঘরের মধ্যে বসে কি করবে? 

এই লেখাটা স্কুলের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের জন্য। এমনিতে বড়দের পড়ার দরকার নেই। যাদের বাড়িতে স্কুল পড়ুয়া বাচ্চারা আছে আর তারা এই লকডাউন অবস্থায় ঘরে বন্দী থাকতে চাইছে না, কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না, এটা তাদের উদ্দেশ্যে লেখা। 

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ঘরের মধ্যে কিছুদিনের জন্য বন্দী হয়ে থাকা, বাইরের লোকের সংস্পর্শে না আসা। বার বার করে হাত ধোয়ার কথা বলছেন সবাই। এখানে ওখানে হাত লাগিয়ে আমরা অজান্তেই হাত দিয়ে চোখ কচলাই, নাক চুলকাই, মুখে হাত দিয়ে ফেলি। এগুলো ভালো অভ্যাস নয়, কিন্তু এখন এসব বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই যতটা বিপদমুক্ত  থাকা যায়, তার চেষ্টা করতে হবে। 

কিন্তু, ঘরে বসে আমরা করব টা কি? আসলে, করার আছে অনেক কিছুই যা আমরা সেভাবে ভাবি নি কখনো, ভাবার সময় পাই নি।  

ঘরে বসে, বিছানায় শুয়ে গল্পের বই পড়তে পারি,  উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা কত কি!  সাহিত্য পড়া খুব দরকার। আমাদের ভাষা জ্ঞান বাড়ানো, ভাবনার জড়তা কাটানো,  আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতাকে উস্কে দেওয়া, দুনিয়াটাকে অন্য চোখে দেখা, গভীর ভাবে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে শেখা অথবা নিছক কিছু আনন্দ পাওয়া বা এটা ওটা জানা, এসবের গুরুত্ব অপরিসীম। 

কিন্তু, সারাদিন কি আর শুধুই বই পড়া যায়? তার উপর সিলেবাসের পড়ার চাপ তো আছেই। বাড়িতে অনেক লোক থাকলে অনেকরকম ইন্ডোর গেমস তো খেলা যেতেই পারে! কিন্তু, যে বাড়িতে বেশী লোকজন নেই, মা বাবা আর তুমি, সেখানে তো তা সেভাবে চলবে না। 

তাহলে?
তাহলে...গান শোনো, টিভি তে ভালো অনুষ্ঠান দ্যাখো, সিনেমা দ্যাখো। কিন্তু সবকিছু ভালো নয়, মা-বাবারা পারমিশন দেবেন না সবকিছু দেখার। কাজেই আরো কিছু রাস্তা খুঁজতে হবে। আর কি করা যায়?
 
আসলে নিজের সাথে নিজে সময় কাটানো খুব কঠিন কিন্তু এর থেকে ভালো কিছু আর হয় না। 

কেউ যদি মিউজিক শেখে, ধরো গীটার বা তবলা বা বেহালা অথবা ক্লাসিক্যাল ভোকাল বা কিছু, তবে তো লাগাতার প্র‍্যাকটিস করার জন্য এর থেকে ভালো সুযোগ আর আসবেই না! 

বাড়িতে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ আছে? তাহলে,  দারুণ হবে এই সুযোগে টিউটোরিয়াল বা ইউটিউব দেখে দেখে একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম (ধরা যাক, পাইথন বা সি প্লাস প্লাস বা জাভা) শিখে ফেলা। প্রচুর কাজে লাগবে সারাজীবন।

আগামী যুগ হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডাটা সায়েন্সের যুগ। এই ছোটো একটু শুরু থেকেই কবে যে কম্পিউটার এক্সপার্ট হয়ে উঠবে বুঝতেই পারবে না। ভালো কথা, এইসব কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ইত্যাদির জন্য আজকাল তোমার হাতের টাচ ফোনই (android phone) যথেষ্ট। কত কি যে app আছে, খুঁজলেই পাবে, নয়তো পরে কিছু কিছু বলবো। পাইথন প্রোগ্রামিং এ টার্টেল দিয়ে অথবা scratch প্রোগ্রামিং দিয়ে ছবি আঁকা, animation করা গেম বানানো এসব অনেক কিছু করা যেতে পারে। এখন নিজে নিজে খুঁজে নাও। পরে বলব আবার সময় হলে। 

ওহ! আরো তো কত কি আছে! বলে শেষ করা যাবে না। যেমন ধরো, ইন্টারনেটের ডাটা প্যাক থাকলে বা ব্রডব্যান্ড কানেকশন থাকলে ল্যাপটপ বা মোবাইলে তুমি প্রচুর বড় বড় লোকেদের দারুণ দারুণ সব বক্তব্য শুনতে পারবে। কত কি নিয়ে যে লোকজন ভাবে, কতরকম কাজ করে তার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। অনেক কিছুই বুঝতে, শিখতে পারবে তাদের টক (talk) থেকে। এরকমই একটা সাইট (site) হলো টেড টক (TED Talk). গুগুল সার্চ করে দেখে নাও কিংবা মোবাইলে, গুগুল প্লে স্টোরে গিয়ে এর app ইনস্টল করে নাও। 

এখনো আরো অনেক কিছু করার আছে। যারা অঙ্ক ভালোবাসো, নাম্বার নিয়ে খেলতে ভালোবসো বা ধাঁধা সলভ করতে ভালোবাসো তাদের জন্য আছে অফুরন্ত রিসোর্স! বই, ইন্টারনেট ইত্যাদি। 

এরপরও, আরো কত কি তুমি করতে পারো, তোমার উদ্ভাবনী শক্তির স্বাক্ষর রাখতে পারো। এটা ওটা করে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে পারো, হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে। arvindguptatoys.com একটা অসম্ভব ভালো সাইট, যেখান থেকে অনেক আইডিয়া পেতে পারো। 

পর্যবেক্ষণ! Observation! খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জীবনে, আমাদের বড় হয়ে উঠার জন্য। এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যার যতো বেশী থাকবে আগামী দিনের দুনিয়ায় সে রাজত্ব করবে! আর, একজন বিজ্ঞানী হয়ে উঠার প্রাথমিক শর্ত হলো এই power of observation! যেমন ধরো এক কাপ জল নিয়ে তার উপর এক দুটো মুড়ি ফেলে দিলে যে সেগুলো কোনোমতেই কাপের মাঝে না থেকে ধারে চলে যায় এটা ছোটোবেলায় খেলার ছলে কত দেখেছি। পরে একটু বড় হয়ে ফিজিক্স পড়তে গিয়ে জেনেছি, কেন হয়। এরকম আরো কত কি! বাড়িতে বসেই কত কি, যা দেখেও দেখো নি, এখন দ্যাখো, মনে রাখো, লিখে রাখো, বিচার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করো। 

যা হোক, এবার চলো ঘরে বসে একটা ছোট্ট পর্যবেক্ষণ করি, একদম সায়েন্টিফিক মেথডে। 

এই যে আমরা বলি, এত পার্সেন্ট চান্স বা অমুক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা (probability) এত পার্সেন্ট ইত্যাদি, এর মানে কি? আমরা কয়েন টস (coin toss) করি; ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার শুরুতে তো করতেই হয়। আমরা জানি যে একটা কয়েন বা পয়সার দুটো পিঠ, হেড আর টেল। কয়েন টস করলে, কোন দিকটা পড়বে, আমরা আগে থেকে বলতে পারি না। অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, এটা বলতে পারি হেড বা টেল পরার চান্স (probability) ফিফটি-ফিফটি (50-50)। এটা জানলাম কি করে? আসলে, এই যে প্রোবাবিলিটি, এটা দিয়ে বিস্তর সব অঙ্ক আছে যা দিয়ে আমাদের জীবন, আমাদের সভ্যতা, আমাদের প্রকৃতির কান্ডকারখানা (Study of how Nature works), ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজির নানা কিছুর হিসেব নিকেশ, মডেল অনুমান করা হয়। বড় হয়ে পড়বে সেসব। Probability and Statistics (সংখ্যাতত্ব) যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় সেসব বড় হলেই জেনে যাবে! 

প্রোবাবিলিটির সংজ্ঞা আমরা দিই এভাবে, ধরা যাক তুমি কয়েন টস করে হেড পড়বে কি পড়বে না তার প্রোবাবিলিটি হিসেব করতে চাইছো, বুঝতে চাইছো যে হেড পড়ার চান্স কেন ৫০% বা 0.5 বা
1/2 হবে। তাহলে, কতবার হেড পড়লো তার হিসেব যদি রাখি আর কতবার টস করলাম তা যদি মনে রাখি, তা দিয়ে একটা হিসেব করা যাবে। কতবারের মধ্যে কতবার সফল হলাম, এই অনুপাতই হলো প্রোবাবিলিটির হিসেব! তবে একবার দুবার কয়েন টস করলে হবে না। বার বার, অসংখ্যবার (actually, infinite times) করে দেখতে হবে। 

দেখা যাক! একটা এক টাকার বা দু টাকার কয়েন নাও। খাতা কলম নাও। ছক কষে বা টেবিল করে হিসেব রাখো কতবার হেড পডলো আর কতবার টেল পড়লো। তারপর সবার শেষে কতবারের মধ্যে কতবার হেড (বা টেল) পড়লো, এই অনুপাত (ratio) টা দ্যাখো 0.5 বা ৫০% এর কাছাকাছি যাচ্ছে কিনা। তবে হ্যাঁ, দু চারবার বা দশবার করলে হবে না। প্রথমে দশবার করো, তারপর ২০ বার, ৫০ বার, ১০০ বার, ১০০০ বার... 
বার বার করে দ্যাখো যে সেই অনুপাত কিভাবে 0.5 এর দিকে যাচ্ছে, যত তুমি কয়েন টসের সংখ্যা [যাকে কিনা বলে, ট্রায়াল (trial)] বাড়াচ্ছো। এটা প্রোবালিটি সম্পর্কে শেখার একটা প্রাথমিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। 

এরপর একই রকম করে একটা লুডোর ছক্কা নিয়ে দ্যাখো, কখনো পুট (১) পড়ছে, কখনো ৩ বা ছক্কা (৬) পড়ছে ইত্যাদি। বার বার করতে থাকলে, বলোতো, ছক্কা বা পুট পড়ার প্রোবাবিলিটি কত? এভাবেই বার করো, তারপর বলো। এটা হয়ত তোমার জীবনের প্রথম গবেষণা! 

তোমাদের সুবিধার জন্য আমি একটা প্রাথমিক ছক দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু তুমি নিজের সুবিধামত ভাবনাচিন্তা করে ছক বানিয়ে নিতে পারো। আর, হিসেব রাখার জন্য ট্যালি মার্কস (///) খুব সুবিধাজনক। যেমন একটা হেড পড়লো, তুমি হেডের ঘরে একটা বাঁকানো লাইন (slanting line) টানলে, তারপর আবার পড়লে, আবার একটা লাইন তার পাশে, এরকম করে চারবারের পর পাঁচবারের সময় ক্রস করে দিলে বা কেটে দিলে। তাহলে এরকম পাঁচটা পাঁচটা করে ক্রসযুক্ত ছবি দেখে পরে চট করে হিসেব করার সুবিধা হয় আর কি। অবশ্য তুমি হিসেব রাখার আরো কোনো ভালো মেথড আবিষ্কারও করতে পারো।

তোমার রেজাল্ট তুমি বন্ধুদের সাথে ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করতে পারো। দ্যাখো কে কত পেলো। করতে থাকো। কিন্তু ঘরের বাইরে এখন কদিন বেরিয়ো না। সুস্থ থাকাটা খুব জরুরি। একটা ছক নীচে দিলাম। 




(অভিজিৎ কর গুপ্ত)

Comments

Popular posts from this blog