ক্ষ্যাপা বিজ্ঞানীদের গল্প

----------------------------------

এসো, আজকে কয়েকজন চেনাজানা বিজ্ঞানীদের গল্প শোনাই। কথায় বলে বিজ্ঞানীরা পাগলাটে বা ক্ষ্যাপা হয়! এটা হয়ত সবসময় সত্যি নয়। তবে কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভাবনার গভীরে ঢুকে পড়লে যে আর তাদের আর কান্ডজ্ঞান থাকে না, তা বলাই বাহুল্য।
এ্যম্পিয়ারের নাম তোমরা হয়ত সবাই জানো। আঁন্দ্রে মারী এ্যম্পিয়ার (Andre Marie Ampere 1775 - 1836), ফরাসী মানুষ, তাই বাংলায় বা ইংরেজিতে নাম টা হয়ত ঠিকঠাক লেখা হলো না। সে যাক গে। তড়িৎপ্রবাহ (current)-এর একক যে ampere, সে তো আমরা সবাই জানি। পরে বড় হয়ে জানবে যে এই তড়িৎপ্রবাহ সংক্রান্ত, বা আরো বিষদ করে বললে, তড়িৎ ও চুম্বক সংক্রান্ত পদার্থবিজ্ঞানের যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যাকে বলে তড়িৎ চুম্বকীয় তত্ত্ব (Electromagnetism) তাতে তার অবদান অসামান্য!অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। খুব ছোটোবেলাতেই তখনকার দিনের ২০ ভল্যুমের বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া মুখস্থ করে ফেলেছিলেন! তারপর নিজে নিজেই একটা সার্বজনীন ভাষা, যাকে বলে universal language, আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন, আর তার শব্দ সৃষ্টি থেকে শুরু করে ব্যাকরণ সব কিছু। তার বহুকাল পরে অবশ্য এরকম এক ভাষা যার নাম এসপারান্তো (Esperanto), তৈরি হয়েছিলো যাতে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষ তার সাহায্যে কথা বলতে পারে।
যা হোক, ব্যাপারটা হলো এ্যম্পিয়ার মশাই কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন, যখন তাঁর মথায় অঙ্ক বা পদার্থবিজ্ঞানের কোনো বিষয় খেলা করতো! পকেটে সবসময় চক রাখতেন। কোথায় কখন যে কিছু লেখার দরকার দরকার হয়ে পড়বে! সুবিধামতো কিছু একটা সমতল পেলেই হলো, সে ব্ল্যাকবোর্ড, দরজা, টেবিল বা পার্কের বেঞ্চ যাই হোক না কেন! প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়েছেন, পকেটে চক। ভাবতে ভাবতে চলেছেন। এবার অঙ্ক টা করে দেখার ইচ্ছা হলো। ভাবনায় ডুব দিতেই ওমনি চোখের সামনে যেন একটা ব্ল্যাকবোর্ড এসে হাজির! রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে মনের সুখে তিনি অঙ্ক কষতে লাগলেন। পুরো ব্ল্যাকবোর্ড প্রায় ভর্তি হয়ে উঠলো অঙ্কের ইক্যুয়েশনে! একটা নতুন কিছু আবিষ্কার! হঠাৎ দেখলেন, একি! ব্ল্যাকবোর্ড তো তাঁর কষা অঙ্ক সহ দূরে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত! অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন, অসহায়ের মতো।  ভাবলেন, দৌড়ে গিয়ে ধরবেন কিনা! কিন্তু তা আর হলো না। চোখের সামনে তাঁর আবিষ্কার অদৃশ্য হয়ে গেলো আর তিনি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। সম্বিৎ ফিরতেই তিনি খেয়াল করলেন যেখানে তিনি ব্ল্যাকবোর্ড ভেবে অঙ্ক করছিলেন, সেটা আসলে রাস্তার ধারে পার্ক করা একটা hansom cab, মানে হলো এক বিশেষ ধরণের সে সময়কার ঘোড়ায় টানা গাড়ি, যার পিছন দিকটা কালো রং করা। গাড়ির ড্রাইভার বা সহিস খেয়াল করেন নি, তার যখন সময় হলো তিনি গাড়িতে উঠে ঘোড়ায় লাগাম দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে চললেন! পিছনে যে এ্যম্পিয়ার মশাই দাঁড়িয়ে অঙ্ক করে যাচ্ছেন তা আর তিনি জানবেন কি করে?
পরের গল্পটা নীলস বোহর (Neils Bohr, 1885 - 1962) কে নিয়ে। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এর এই বিজ্ঞানীর নাম কে না শোনে নি। আইনস্টাইন আর বোর (উচ্চারণ টা হয়ত বোর আর বোহর এর মাঝামাঝি কিছু হবে।) -এর নাম আমরা সবাই জানি, পৃথিবীর সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে পড়ে। পরমাণুর গঠন নিয়ে তাঁর যে মডেল, সে সংক্রান্ত অঙ্ক ও ভাবনা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের (Modern Physics) জন্ম দিয়েছিলো। 1922 সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। পরে তাঁর ছেলে আগে বোর (Aage Bohr) ও নোবেল পান ১৯৭৫ সালে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো এনাকে একবার দেখার। বাপ ব্যাটা দুই নোবেল লরিয়েট! ভাবা যায়!
সে যাই হোক, নীলস বোর ও তাঁর ভাই হেরাল্ড বোর (ইনি আবার ছিলেন খুব নামকরা একজন গণিতজ্ঞ Mathematician) দুজনেই কিন্তু ভালোমতো খেলাধূলা করতেন  (notable athletes)। হেরাল্ড তো ডেনমার্কের ন্যাশানাল টীমের হয়ে ফুটবল খেলে ১৯০৮ এর অলিম্পিকে রূপোর মেডাল পেয়েছিলেন! আর নীলস বোর একটা ড্যানিশ ফুটবল ক্লাবে খেলতেন গোলকিপার হিসেবে। বেশ লম্বা ছিলেন তিনি, গোলকিপার হবার আদর্শ চেহারা যেন!
তো, একবার হলো কি, নীলস দের ড্যানিশ ক্লাবের সাথে একটা জার্মান ক্লাবের খেলা। মাঠ ভর্তি দর্শক। অবশ্য নীলস দের ক্লাব এতটাই শক্তিশালী ছিলো যে জার্মান ক্লাব পেরে উঠছিলো না। খেলার বেশীরভাগ সময় জার্মান দের হাফেই একশান চলছিলো! বেচারা নীলস আর কি করবে! বল তো এদিকে আসছিলোই না, তাই গোলকিপারের কোনো কাজ নেই! হঠাৎ কি হলো, একটা কাউন্টার এ্যটাকে বল ড্যানিশ দের দিকে ধেয়ে এলো! সবাই ভাবলো নীলস এর কাছে কোনো ব্যাপারই না, দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল বগলদাবা করে ফেলবে সে! কিন্তু এ কি! নীলস চুপ করে দাঁড়িয়ে! যেন ভাবনায় বিভোর হয়ে কেমন উদাস হয়ে আছে! এদিকে দর্শকরা চীৎকার করছে, নীলস বল ধরো, নীলস বল ধরো!! এই চীৎকারে নীলসের সম্বিৎ ফিরলো। যাই হোক এ যাত্রায় গোল টা খেতে হলো না। কিন্তু ম্যাচের শেষে সবাই নীলস কে ঘিরে ধরে জানতে চাইলো, সে কেন খেলার মাঝে অমন উদাস হয়ে গিয়েছিলো, বল যে ধেয়ে আসছিলো খেয়ালই করছিলো না। নীলস বোর বলেছিলেন, আসলে এই খেলার মাঝে (যতক্ষণ বল অন্য পক্ষের দিকে ছিলো) তাঁর মাথায় একটা পদার্থবিজ্ঞানের হিসেব (calculation) চলে এসেছিলো, তাই তিনি গোলপোস্ট টা কে মনে মনে ব্ল্যাকবোর্ড ভেবে গভীর মনোযোগ দিয়ে অঙ্ক করছিলেন! বোঝো ঠ্যালা!!
অবশ্য পরে পড়েছি, নীলস বোর তাঁর বিরাট অফিসে ঘুরে ঘুরে অঙ্ক বা বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে বিড়বিড় করে বলে যেতেন যা মাথায় আসতো, আর তাঁর কেউ এসিট্যান্ট থাকতো অনেক সময়েই, যে সব লিখে ফেলতো!এসব কিন্তু, একটুও বানিয়ে বলছি না। সব সত্যি গল্প!
(অভিজিৎ কর গুপ্ত। email: kg.abhi@gmail.com)

Comments

Popular posts from this blog